খুলনা, বাংলাদেশ | ২০শে চৈত্র, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ | ৩রা এপ্রিল, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ

Breaking News

  ঢাকার ধামরাইয়ে যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে বৃদ্ধ নিহত
  বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ৩৭% শুল্ক আরোপ করল যুক্তরাষ্ট্র

আশাশুনির ভাঙন পয়েন্টে বিকল্প বাঁধ নির্মাণ শুরু, শ্রমিক ও সরঞ্জামের অভাব

নিজস্ব প্রতিবেদক, সাতক্ষীরা

সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার বিছট গ্রামের পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবে) বেড়িবাঁধ ভাঙনের ৪৮ ঘন্টা পর বুধবার (২এপ্রিল) সকালে ভাটার টানে প্লাবিত এলাকা থেকে পানি নামার সময় ধীরগতিতে ভাঙন পয়েন্টে একটি বিকল্প রিংবাঁধ নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ, পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ও সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধায়নে যশোরের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ব্রাউন ফিল্ড এর মালিক জাহিদ এই বেড়িবাঁধ নির্মাণের কাজ করছেন।

এদিকে বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ায় আনুলিয়া ইউনিয়নের ৫টি গ্রাম আংশিক ও একটি গ্রাম সম্পূর্ন খোলপেটুয়া নদীর পানিতে প্লাবিত হয়েছে। এতে করে ওইসব গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। প্লাবিত এলাকার পঞ্চাশের অধিক কাঁচা ঘরবাড়ি ধসে পড়েছে। পানিবন্দি পরিবারের অনেকেই এলাকা ছেড়ে নিরাপদ স্থানে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। নদীর লোনা পানিতে ডুবে গ্রামের নিম্মাঞ্চলে লাগানো বোরো ধানে পঁচন ধরেছে। অনেকে আবার পানিতে নিমজ্জিত কাঁচা ধান কেটে নিচ্ছে। প্লাবিত এলাকা থেকে বয়ষ্ক লোকদেরকে আগেই নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। পোশা গরু ও ছাগল উচু বেড়িবাঁধের উপর বেধে রাখা হয়েছে। অনেকে গবাদিপশু নিয়ে বিড়ম্বনায় পড়েছে। তারা সাথে গো খাদ্যের সংকট দেখা দিয়েছে। পানিতে ডুবে যাওয়ায় অনেক পরিবার বাড়িতে চুলা জ্বালাতে পারছেন না। ফলে বিছট গ্রামের বেশ কিছু পরিবার তাদের বাড়িঘর ছেড় দিয়েছেন।

বিছট গ্রামের আব্দুস সবুর গাজী (৭৩) তাঁর বাড়ি দেখিয়ে বলেন, পানিতে ডুবে যাওয়ায় বাড়িঘর ছেড়ে দিয়েছেন। গত রোববার রাতে ভাত খেয়েছিলেন। তারপর শুকনা খাবার খেয়ে কোনোরকমে বেঁচে আছেন। ছোট ভাই শওকত হোসেনের দোতলা বাড়ি দেখিয়ে বলেন, ওই বাড়িটিও ঝুঁকিতে পড়েছে।

একই গ্রামের আবদুল করিম জানান, বাড়ির কোথাও শুকনা জায়গা নেই যে চুলা জ্বালিয়ে বাচ্চাকাচ্চাদের খাবার রান্না করে দেবেন। মুড়ি–চিড়া খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন। শিশুদের নিয়ে সবাই সমস্যায় রয়েছেন।

বল্লভপুর গ্রামের রমজান মোড়ল পানিতে তলিয়ে যাওয়ার কাঁচা ধান কাটচ্ছিলেন। তিনি জানান, তিন বিঘা জমিতে ধান লাগিয়েছিলেন ধান ভালোই হয়েছিল। ৬০ থেকে ৭০ মন ধান হবে বলে আসা করছিলেন। বাধ্য হয়ে কাঁচা ধান কেটে নিচ্ছেন, যদি দু–চার বস্তা ধান পাওয়া যায়, এ আশায়।

বিছট গ্রামের জয়নাল মোল্যা জানান, নদীর পানিতে বাড়ি ঘর তলিয়ে গেছে। উঠানে হাটুর উপওে পানি। আমার সহ আশেপাশের প্রতিবেশীর বেশ কয়েকটি কাঁচা ঘর ধসে পড়েছে। আমার বড় ভাই বৃদ্ধ কাসেম আলী মোল্যাকে বাড়ি থেকে সরিয়ে এক আত্মীয়ের বাড়িতে রেখে এসেছি।

বল্লভপুর গ্রামের আফছার আলী গাজী বলেন, আমার বয়স ৬১ বছর চলে। জীবনে এরকম নদী ভাঙন আর পানি দেখেনি। রাতে ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় নদীর লোনা পানিতে সবকিছু ডুবে গেছে। জিনিসপত্র গুলো থেকে সরানোর সময় পাইনি।

বিছট গ্রামের রুহুল আমি মোড়ল জানান, রাতে জোয়ারে পুরো এলাকা পানিতে টইটম্বুর হয়ে পড়ে। বুধবার সকালের ভাটায় গ্রামগুলো থেকে পানি নদীতে নামতে শুরু করে। সকাল সাড়ে ৭টার দিকে বিছট গ্রামের ভাঙন পয়েন্টের উত্তর-পশ্চিম পাশ দিয়ে বিকল্প রিং বাঁধ দেওয়ার কাজ শুরু করা হয়। শ্রমিক সংকটের কারণে বাঁধ নির্মাণের কাজ ধীর গতিতে চলতে থাকে। দুপুরের দিকে জোয়ারের পানিতে ফের পুরো এলাকা প্লাবিত হয়ে পড়ে।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে আনুলিয়া ইউপির চেয়ারম্যান মো. রুহুল কুদ্দুস জানান, গত সোমবার রাত থেকে তাঁর ইউনিয়নের মানুষ নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে। ঈদে তাঁর ইউনিয়নের মানুষ আনন্দ করতে পারেনি। ইতিমধ্যে বিছট, নয়াখালী, বল্লভপুর, আনুলিয়া, চেঁচুয়া ও কাকবাসিয়া গ্রামের নিম্মাঞ্চল প্লাবিত হযেচে। কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। অনেক মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন। চার শতাধিক মাছের ঘের ভেসে গেছে। শতাধিক বিঘার বোরো ধানের খেত তলিয়ে গেছে। শতাধিক কাঁচা ঘরবাড়ি ধসে গেছে।

তিনি আরো জানান, বুধবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে রিং বাঁধ দেওয়ার কাজ শুরু করা হয়। জিওটিউব দিয়ে আধুনিক পদ্ধতিতে কাজ শুরু করা হয়েছে। তবে ন্যুনতম পাঁচটি বাল্কহেড দরকার, সেখানে পানি উন্নয়ন বোর্ড সরবরাহ করেছে মাত্র দুটি। এ জন্য কাজ চলছে ধীরগতিতে। যত সময়ক্ষেপণ হবে, ততই বাঁধের ভাঙনের পরিধি বাড়বে।

সাতক্ষীরা পাউবো বিভাগ-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী শাখাওয়াত হোসেন বলেন, বাল্কহেড পাওয়া যাচ্ছে না। পাওয়া যাচ্ছে না দক্ষ শ্রমিক। তারপরও আজ সকাল সাড়ে সাতটার দিকে রিং বাঁধ দেওয়ার কাজ শুরু করেছেন। আধুনিক পদ্ধতির জিওটিউব দিয়ে বাঁধের কাজ চলছে। এটি সফল হলে তিন থেকে চার দিনের মধ্যে পানি আটকানো সম্ভব হবে বলে জানান তিনি।

খুলনা গেজেট/ টিএ

 




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

© 2020 khulnagazette all rights reserved

Developed By: Khulna IT, 01711903692

Don`t copy text!